Friday, March 17, 2006

বোকাদের পদ্য : ক্রিসমাসের নাটক


প্রত্যেক ক্রিসমাসে স্কুলে নাটক হতো
তুমি অবধারিতভাবে রাজকন্যার গুলগুল্লা রোল পেয়ে যেতে
নীরব সন্তুষ্টিতে তোমার গালে বেগুনি আঁচ লাগতো,
আমি দেখতাম আমার ভুরুর আড়াল থেকে।

আমাকে সবাই বলতো নিয়ান্ডার্টাল হিমু
নাটকের স্যার মৃদু হেসে বলতেন, কোয়াসিমোদো ...
আমি তখনও জানতাম না ... নোতরদামের কুঁজো তো পড়বো স্কুল ছেড়ে যাবার পর, নইলে তখনই আঁচড়ে খামচে উঠে পড়তাম স্কুলের পাশের পুরানো চার্চটা বেয়ে।

স্কুলের নাটক একেক বছর একেকটা,
কিন্তু সবই লিখতেন নাটকের স্যার
সেখানে রাজকন্যা আর কুৎসিত ক্রীতদাস থাকবেই
কারণ তুমি পড়তে সে স্কুলে
আর আমিও পড়তাম
আমরা নাটক ভালোবাসতাম, দু'জনেই ...।

আমি সেই ছোট্ট তোমাকে নতজানু হয়ে কুর্ণিশ করেছি,
যখন আমি সেই ছোট্ট আমি ছিলাম
হাঁটু গেড়ে বসে কতবার রাজকন্যার জুতোর ফিতে বেঁধেছি আমি ক্রীতদাস
আমার হাতে বর্ষাতি আর টুপি সঁপে দিয়ে কত ভিনদেশি রাজপুত্র তোমার পদ্মকোরকের মতো নরম হাত নিজের মুঠোয় নিয়েছে এক এক বছর
আমি সেই টুপিবর্ষাতির ভুলে যাওয়া ন্যাপথলিনের গন্ধ নতুন করে ফিরে পেয়ে চমকে দাঁড়িয়ে থেকেছি

কত নাটক করলাম আমরা দু'জন
কত মারপিট, অস্ত্রের হ্রেষাধ্বনি
মঞ্চে গড়াগড়ি দিলো কত সুপুরুষ স্কুলপড়ুয়া
আর তুমি জড়িয়ে ধরলে আরো সুপুরুষ কতো স্কুলপড়ুয়াকে
আমি ক্রীতদাস ছেঁড়া পাজামার হাঁটু ময়লা করে চিনে নিলাম তোমার প্রতি বছরের নাটকের জুতোর ফিতাবিন্যাস
রাজপুত্রদের বর্ষাতির বল্লরী
আর, নিথর দাঁড়িয়ে থেকে, মঞ্চে, তোমাকে।

সামনে ক্রিসমাস আসছে, রাজকন্যা
আমি, নিয়ান্ডার্টাল হিমু, নাটকের স্যারের কোয়াসিমোদো
এবার সটান মাথা উঁচিয়ে বলবো আমার ভাঙা গলায়,
স্যার আমি আর নাটক করবো না।




Sunday, March 12, 2006

বোকাদের পদ্য : ফোন



... ফোনের এপাশে আমি ঘুমিয়ে পড়তাম
তুমি তবু কিছুক্ষণ, নামিয়ে রাখার আগে
আমার শ্বাসের শব্দ শুনে যেতে, পরে বলেছিলে ...
আমার শ্বাসের শব্দে তোমার বুকের তালা একটা একটা করে খুলে যেতো
অচেনা লটারি অঙ্ক একটা একটা করে মিলে যেতো
তারাগুলো উল্কা হয়ে খসে পড়তো, আর মনে হতো,
শিল পড়ে, সুপুরির গাছগুলো দুলছে বাতাসে

গতকাল হঠাৎ হাওয়ায় গাছ দুলেছিলো,
আর শিল পড়া শব্দ তুলে দূরে গান বেজে উঠেছিলো
অনিচ্ছাসত্ত্বেও
আমি তালা খুলে খানিকটা শ্বাস ফেললাম ...



Saturday, March 11, 2006

বোকাদের পদ্য: প্রতিশ্রুতি


[যথারীতি পুরনো কবিতা, ফেব্রুআরি ০২, ২০০৫ এ প্রকাশিত, মঙ্গার দিনে মরাইয়ের তলা থেকে বার করে আনা ধানের মতো৷ কী করবো, লিখতে পারছি না৷ কার কাছে ক্ষমা চাইবো? প্রতিশ্রুতাদের কাছেই চেয়ে নিই৷]


হিমু বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে
ভোরের বাতাস আর তারাদের সে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো
একদিন সে ঠিক ঠিক বিপ্লব করে সূর্যের নিচে পৃথিবীটাকে পাল্টে দেবে
কিন্তু সে স্বপ্নই দেখতো কেবল, বিপ্লব আর তার করা হয়ে ওঠেনি
কারণ সে ঘুমোতে ভালোবাসে
আর তাই একদিন ভোরে তাকে বিপ্লব না করার অপরাধে জেলে ঢুকতে হয়৷

হিমু জেলে ঢোকার আগেই কারাবাস নিয়ে বিস্তর কবিতা লিখেছে
সেগুলো আদৌ কবিতা নয়, পেনসিল বুলিয়ে সে কবিতার খাতাকে প্রতিশ্রুতি দেয়
একদিন কারাবাসের সব যন্ত্রণা সে কাগজে সঁপে দেবে, এইসব হাবিজাবি .. ..
জেলে ঢুকে কিন্তু সে হাতের কাছে কাগজ বা পেনসিল পায় না
আমরা তাকে দেখি, জানালা থেকে দূরে বসে সে তাকিয়ে
সেই এক চিলতে ঘরের জানালায় একমুঠো আকাশের দিকে তাকিয়ে সে শ্বাস নেয়
আর তাকে সঙ্গ দেয় এক মুঠো রোদ, এক মুঠো রাত, এক মুঠো মেঘ .. ..
সেই মুঠো মুঠো বান্ধবের কাছে সে প্রতিশ্রুতি দেয় .. .. আমরা শুনি .. ..
জেল থেকে বেরিয়ে সে আকাশটাকে একটু তাকিয়ে দেখবে,
খেলা করবে রোদ, অন্ধকার আর বৃষ্টির সাথে৷

তার এই অঙ্গীকারের ফিসফিস বাতাসে কি একটু বেশিই ছড়িয়ে যায়?
কর্তৃপক্ষ এই কথা শুনে হেসে খুন
তারা বলে, 'দাও ব্যাটাকে ছেড়ে৷'
হিমু তার কারাকক্ষের বন্ধুদের ছেড়ে অনেকের ভিড়ে বেরিয়ে আসে৷

আমরা তার দেখা পাই কিছুদিন পর
ভেবেছিলাম এদ্দিন জেল খেটে বোধহয় শুধরেছে ব্যাটা
হয়তো সত্যি সত্যি সে সময় দিচ্ছে তার একমুঠো রোদের বন্ধু আকাশজোড়া রোদ,
একমুঠো রাতের সঙ্গী আকাশজোড়া রাত আর একমুঠো মেঘের স্যাঙাত্‍ একগুচ্ছ মেঘকে
কিন্তু আমরা তাকে খুঁজে পাই তার ঘরে
ঘুমোচ্ছে সে
তার বিছানার পাশে রাখা কয়েক টুকরো নুড়ি আর সুড়কি
আমরা বুঝতে পারি, সেই পাথর আর মাটির টুকরোর কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে হিমু
একদিন অনেক বড় এক কারাগার গড়ে তুলবে সে .. .. ৷


Thursday, March 09, 2006

বোকাদের পদ্য: মেঘের কবিতা


[পুরনো কবিতা, এপ্রিল ১৮, ২০০৫ এ প্রকাশিত৷ মন ভালো নেই৷]


.. .. যতই আপন ভাবো, মেঘেরা নিজের মতো চলে
এক মেঘ কোনদিন দু'বার ঢাকে না আমাদের
পাড়ের রূপোলি রেখা ধরে ধরে মিছিমিছি খুঁজে
চেনা কি যাবে সে মেঘ, যে শুধু বৃষ্টির কথা বলে?


হাওয়াকে যায় না ছোঁয়া, মেঘেরা আয়ত্ব থেকে দূর
কিন্তু তারা একে অন্যকে ছুঁয়ে নিঃসঙ্গতা মোছে
আমিও বাতাস হয়ে তোমাকে ভাসাবো বলে ছুটি
তুমিও মেঘের মতো, কিংবা কোন বিষন্ন কর্পূর .. ..৷


আমি ছোঁবো, এই ভয়ে জল হয়ে ভেঙে পড়ো যদি
এমনই আশঙ্কা থেকে পিছু হটে দূর থেকে দেখি
আকাশে মেঘেরা চলে, হাওয়ার খেয়ালে যেন আঁকা
শুন্যে কোন কাশবন চিরে যাওয়া অকারণ নদী৷


যতই আপন ভাবি, তোমার রূপোলি পাড় হাসে
আমি দেখি .. .. তুমি-মেঘ অন্য হাওয়া ছুঁয়ে ছুঁয়ে ভাসে৷


Tuesday, March 07, 2006

নস্টালজিয়া



নস্টালজিয়া আমাকে দ্যায় না অবসর
ব্যস্ততায় দুঃখযোনি স্মৃতি এসে বেদম খ্যাদায়
আমাকেই
দীর্ঘ পথ দীর্ঘতর দুশ্চিন্তার জরায়ুর
নাম ভূমিকায়
অভিনয় করে, করে যায়,
তবু হাঁটি
কত দিন রাত সেজে পার হলো? কতটা বছর?
নস্টালজিয়ার দাঁতনখে বন্দী পলকা অবসর৷


Wednesday, March 01, 2006

বোকাদের পদ্য : আক্ষেপ



কাকের উড্ডাল ধরে এগোলেও অযুতেক ক্রোশ
দূরে আছি
তবু
ভাবি, এখনো শরীরজলে ডুবে
সঞ্চিত নিশ্বাস ফেলি মুখ রেখে স্তনের বিষুবে
একবার, বারবার .. ..
ঘ্রাণ নিই নিপাট সন্তোষে৷
আমার আক্ষেপ ছোঁয়া দিয়ে
যায় অযুতেক ক্রোশে৷