Friday, January 27, 2012

সেজারিয়ার জন্যে


পশ্চিম আফ্রিকার উপকূলে সেনেগাল আর গিনি বিসাউ থেকে আরো পশ্চিমে, আটলান্টিককে নিচে ফেলে আকাশ দেখার জন্যে জেগে উঠেছে যে কয়েকটা আগ্নেয় পাথরের দ্বীপ, সেই রুক্ষ মরুস্পৃষ্ট দ্বীপদেশ কাবো ভের্দেতে কয়েকটা পতাকা নতমুখে ভাবছিলো সেজারিয়ার কথা। কারণ সেজারিয়া আর নেই।
বুড়িটা মারা গেলো শেষ পর্যন্ত। সত্তর বছর বয়স, আর কতো? অনেক তো গান হলো, অনেক সরাইখানায় টিমটিমে আলোর নিচে বিষণ্ণ সমুদ্রগন্ধী সন্ধ্যায় সঙ্গ দেয়া হলো অনেক কাভাকিনিয়োর টঙ্কার আর গন্তব্যের খরায় ভোগা মদ্যপদের, খালি পায়ে মঞ্চের ওপর ঘুরে ফিরে গাওয়া হলো পুরনো-নতুন মোরনায় বিচ্ছেদবিষাদের গান, শেষ কয়েকটা মাস সেজারিয়া এভোরা নিজেকে সঁপে দিলো দুরন্ত শ্বাসকষ্ট আর হাঁপিয়ে ওঠা হৃৎপিণ্ডের কাছে।
কাবো ভের্দে এক দুর্ভাগা দেশ। মানুষের বাস ছিলো না সেখানে। পূর্বে চোখের আড়ালে থেকেও সাহারা হাত বাড়িয়ে বসে আছে আটলান্টিকের ওপার থেকে, ঊষর মরু এক একটা দ্বীপকে গ্রাস করে শেষ পর্যন্ত হার মেনেছে পর্বতের কাছে এসে শীতল হওয়া মেঘের কাছে। ঐ একটু সবুজ, ঐ একটু জলের ওপর এসে দখল নিয়েছে বোম্বেটে পর্তুগীজরা। মানুষ ছিলো না ওখানে, কিন্তু আফ্রিকার উপকূল থেকে দাস অপহরণের ব্যবসা জমে ওঠার পর এই মরুময় দ্বীপগুলো হয়ে উঠলো দাসবাণিজ্যের আখড়া। যতদিন দাসব্যবসার রমরমা ছিলো, কাবো ভের্দের দিনও ছিলো সোনালি। কালো মানুষ কেনাবেচার দিন ফুরিয়ে আসার পরও শ'খানেক বছর বাণিজ্যপথে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণে রাজারাজড়ার চোখে ধর্তব্য হিসেবে টিকে ছিলো কাবো ভের্দে। সেই দিনও যখন ফুরোলো, পর্তুগীজ দেখলো, এ তো কয়েকটা মরা দ্বীপ শুধু। চাষবাস নেই, খনিজ নেই, আছে শুধু দ্বীপবোঝাই দাস আর শ্বেতাঙ্গের সঙ্কর মানুষ। এদের জন্যে খরচাপাতি করার গরজ হয়নি পর্তুগালের। তবুও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ঠেকিয়ে রাখতে এক পর্যায়ে পর্তুগালের বাইরের প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করে লোকজনকে ভুলিয়েভালিয়ে রাখতে চেয়েছে তারা।
কিন্তু সারা পৃথিবীই তখন ঘুরে দাঁড়িয়ে মুখোমুখি হচ্ছে চাবুক হাতে বুকের ওপর পা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোর। কাবো ভের্দে তার ব্যতিক্রম নয়। শাসকের নিষ্ঠুর উদাসীনতার জবাব এক সময় বারুদ পোড়ার গন্ধে পাওয়া যায়। পর্তুগালের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেই স্বাধীন হয় গিনি-বিসাউ আর কাবো ভের্দে। ততদিনে বাইরের দুনিয়ায় সচ্ছলতার টানে আর রাজনৈতিক ডামাডোলের ঠেলায় দ্বীপের অধিকাংশ মানুষ পাড়ি জমিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে, আর্জেন্টিনায়, ভূমধ্যসাগরীয় ইয়োরোপে, সুদূর উত্তর মেরুবৃত্তের দেশে, এমনকি তাদের মতোই আরেক গরীব দ্বীপ সওঁ তোমে আর প্রিন্সিপেতে। এখনও কাবো ভের্দের অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্বীপটির অধিবাসী জনসংখ্যার চেয়ে বেশি।
ঘর ছাড়ার পর আর ঘরে ফেরা যায় না পুরোপুরি। কিন্তু ঘর ছাড়াও যায় না। সে বিষণ্ণ প্রেতের মতো সওয়ার হয়ে থাকে ঘাড়ে, রাতের বেলা টোকা দেয় জানালায়, মেঘ থেকে গলে পড়ে, চিঠির খাম খুলে বেরিয়ে আসে। কাবো ভের্দের মানুষ, যাদের ঘর এক কালে ছিলো আরো পূর্বে বা দক্ষিণ-পূর্বের উপকূল, বা সাহেলের আরো গভীর বুকে, যাদের পূর্বরমণীদের গর্ভে শ্বেতাঙ্গ দাসব্যবসায়ীরা তাদের জাতির ভিত গেড়েছিলো, তারা এই ঘরছাড়ার বিষাদকে বাঁচিয়ে রেখেছে গানে। কাবো ভের্দের নিজস্ব ঢঙের সঙ্গীত মোরনা। পর্তুগীজ বা কাবো ভের্দে ক্রিওলে তারা তাদের ছোট্ট দ্বীপদেশের সরাইখানাগুলোয় গায় মোরনা গান, ঘুরে ফিরে গেয়ে বলে স্মৃতিকাতরতার কথা, স্মরণ করে ফেলে আসা কোনো কিছুকে যার কাছে আর কখনও ফেরা হবে না। এই বিষাদকে আরো দীর্ঘজীবী করে প্রবাসী কাবো ভের্দেবাসী, যারা অন্য দেশে পুরুষান্তরে বাস করে, অন্য দেশের হয়ে লড়ে, অন্য দেশী হয়ে বাঁচে, কিন্তু নিজেদের খুঁজতে চায় মোরনায় ডুবে। সব কথা শেষ হয়ে যাওয়ার পর তারা থিতিয়ে পড়ে সওদাদে, হারিয়ে ফুরিয়ে যাওয়া একটা কিছুর প্রতি অলঙ্ঘ্য দূরত্বে থেকে ভালোবাসার কথা জানাতে।
সেজারিয়া মোরনা ঘরানাকে সারা দুনিয়ার কাছে পরিচিত করেছেন। অল্প বয়সেই নিজের শহর মিন্দেলোর সরাইখানা আর রেস্তোরাঁর আবছায়া সন্ধ্যায় গান গাইতে নামতে হয়েছিলো সেজারিয়াকে, বছর পঁচিশেক সেভাবে এ দ্বীপ সে দ্বীপ, এ দেশ সে দেশ গেয়ে বেড়ানোর পর প্রথম অ্যালবাম রেকর্ড করার চুক্তিতে কলম ধরেন তিনি। তারপর একের পর এক অনেক অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে, খ্যাতিও বেড়েছে, সারা দুনিয়া ঘুরে গান গেয়েছেন, পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু মঞ্চ থেকে যখন তাঁকে জোর করে টেনে নামালো অসুখ, বিষণ্ণ সেজারিয়া ফিরে গেলেন যে শহরে জন্মেছেন, সেই মিন্দেলোতেই। সওঁ ভিসেন্তের এই মেঘের নিচে পাহাড় আর সমুদ্রে আচ্ছন্ন শহরের একটা ক্লিনিকেই গেলো ডিসেম্বরের মাঝামাঝি মারা গেলেন কাবো ভের্দের গানের পাখি।
সেজারিয়ার গান প্রথম শুনি প্রতিবেশী পর্তুগীজ উগোর কাছে। প্রতিবেশী হিসেবে খারাপ হলেও উগো সঙ্গীতরসিক ছিলো, ব্রাজিল আর পর্তুগালের বেশ কিছু চমৎকার গান তার কাছে পেয়েছিলাম। সেজারিয়ার বিষাদে ভরা খসখসে গলায় গাওয়া সওদাদ গানটি গ্রীষ্মের শেষ হতে না চাওয়া দিনের শেষে শুনে আশ্চর্য একাকীত্বে গ্রস্ত হয়েছিলাম। নিজের দ্বীপ সওঁ নিকোলাউয়ের জন্যে বিলাপ করে গেছে কোনো এক গীতিকার, নিজেকেই প্রশ্ন করছে, কে দেখাবে তাকে দূরের সওঁ তোমে দ্বীপের পথ, আর বলছে, ভালো লাগে না। সওদাদের কোনো সরাসরি অনুবাদ নেই। সওদাদ দেখি আলীসাহেবের বয়ানে আবদুর রহমানের পানশিরের গল্পে, জানালার পাশে বসে যে তুষারের হাত ধরে ফিরে যায় তার বাড়ি। আরো টের পাই, আবদুর রহমান আলীসাহেবেরই নিঃসঙ্গ ঘরকাতরতার ব্যক্তিরূপ মাত্র, পানশিরের জন্যে আবদুর রহমানের সওদাদ অক্ষরের প্রলেপে ঢেকে রাখা দেশের জন্যে আলীসাহেবেরই দহনরেখা। আমাদের বাসায় কাজ করতো যে ছোট্ট মেয়েটা, সে যখন ঘুমের ঘোরে মাকে ডেকে ফেলতো, জেগে উঠে কাঁদতো আর বলতো, বুকটা পোড়ে, হয়তো ওটাই সওদাদ।
সেজারিয়া এভোরা আমার জন্যে কয়েকটা গান রেখে গেছে। তার জন্যে একটা কবিতা আমি লিখতেই পারি।

অলীক বাসযাত্রা
সারা বাস জুড়ে অচেনা মুখের সারি
বাস ছুটে চলে দূর সন্ধ্যার কাছে
সন্ধ্যার পথ ফুরোবে না এই ভেবে
কাঁধে মাথা রেখে বিকেল ঘুমিয়ে আছে।
যেসব আসনে যাত্রী জোটেনি কোনো
ঘন শূন্যতা সেখানে পা তুলে বসে
জানালায় দেখি লাজুক রোদের বুকে
শিমুলের তুলো এসে নতমুখ ঘষে।
সন্ধ্যার পথ ক্রমশ দীর্ঘতর
বিকেলের মাথা ঢেকেছে আমার বুক
কোলে ফেলে রাখা সম্বল ব্যাকপ্যাকে
ঢেকে রাখা কোনো তরুণীর হাসিমুখ।
বাস খুঁজে ফেরে সন্ধ্যার ঘরবাড়ি
সন্ধ্যা পালায় রাতের অন্ধকারে
ফিরছে না কেউ ঘরে চড়ে এই বাসে
যে ছাড়ে ঘর, সে ঘরে কি ফিরতে পারে?

No comments: